Mountain View

জীবনানন্দ দাশের কবিতা ‘ক্যাম্পে’

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ২৪, ২০১৭ at ২:০৯ পূর্বাহ্ণ

ক্যাম্পে
-জীবনানন্দ দাশ
এখানে বনের কাছে ক্যাম্প আমি ফেলিয়াছি ; 
        সারারাত দখিনা বাতাসে
        আকাশের চাঁদের আলোয় 
এক ঘাইহরিনীর ডাক শুনি , –
        কাহারে সে ডাকে !
 
       কোথাও হরিণ আজ হতেছে শিকার ;
বনের ভিতরে আজ শিকারীরা আসিয়াছে ,
       আমিও তাদের ঘ্রাণ পাই যেন ,
       এইখানে বিছানায় শুয়ে শুয়ে
       ঘুম আর আসে নাকো
       বসন্তের রাতে ।
 
      চারিপাশে বনের বিস্ময় ,
                 চৈত্রের বাতাস ,
      জ্যোৎস্নার শরীরের স্বাদ যেন !
      ঘাইমৃগী সারারাত ডাকে ;
কোথাও অনেক বনে – যেইখানে জ্যোৎস্না আর নাই 
      পুরুষ- হরিণ সব শুনিতেছে শব্দ তার ;
      তাহারা পেতেছে টের ,
      আসিতেছে তার দিকে ! 
      আজ এই বিস্ময়ের রাতে    
তাহাদের প্রেমের সময় আসিয়াছে ;
         তাহাদের হৃদয়ের বোন 
বনের আড়াল থেকে তাহাদের ডাকিতেছে জ্যোৎস্নায় ,-
          পিপাসার সান্ত্বনায় – অঘ্রানে- আস্বাদে !
কোথাও বাঘের পাড়া বনে আজ নাই আর যেন !
মৃগদের বুকে আজ কোনো স্পষ্ট ভয় নাই ,
        সন্দেহের আবছায়া নাই কিছু ;
                    কেবল পিপাসা আছে,
                     রোমহর্ষ আছে ।
         মৃগীর মুখের রূপে হয়তো চিতার বুকেও জেগেছে বিস্ময় !
লালসা – আকাঙ্ক্ষা –সাধ – প্রেম-স্বপ্ন স্ফুট হয়ে উঠিতেছে সব দিকে 
          আজ এই বসন্তের রাতে ;
          এইখানে আমার নকটার্ন –।
 
           একে একে হরিণেরা আসিতেছে গভীর বনের পথ ছেড়ে ,
সকল জলের শব্দ পিছে ফেলে অন্য এক আশ্বাসের খোঁজে 
           দাঁতের – নখের কথা ভুলে গিয়ে তাদের বোনের কাছে ওই 
                    সুন্দরী গাছের নিচে- জ্যোৎস্নায় !-
মানুষ যেমন ক’রে ঘ্রাণ পেয়ে আসে তার নোনা মেয়েমানুষের কাছে
                                          হরিণেরা আসিতেছে ।
-তাদের পেতেছি আমি টের 
     অনেক পায়ের শব্দ শোনা যায় ,
      ঘাইমৃগী ডাকিতেছে জ্যোৎস্নায় ।
      ঘুমাতে পারি না আর ;
              শুয়ে শুয়ে থেকে
        বন্দুকের শব্দ শুনি ।
চাঁদের আলোয় ঘাইহরিণী আবার ডাকে ;
        এইখানে প’ড়ে থেকে একা একা 
        আমার হৃদয়ে এক অবসাদ জমে ওঠে 
              বন্দুকের শব্দ শুনে শুনে
               হরিণীর ডাক শুনে শুনে ।
 
        কাল মৃগী আসিবে ফিরিয়া ;
       সকালে – আলোয় তারে দেখা যাবে –
       পাশে তার মৃত সব প্রেমিকেরা প’ড়ে আছে ।
       মানুষেরা শিখায়ে দিয়েছে তারে এইসব ।
আমার খাবার ডিশে হরিণের মাংসের ঘ্রাণ আমি পাব ,
                    …মাংস – খাওয়া হল তবু শেষ ?
                           …কেন শেষ হবে ?
কেন এই মৃগদের কথা ভেবে ব্যথা পেতে হবে 
      তাদের মতন নই আমিও কি ?
     কোনো এক বসন্তের রাতে    
     জীবনে কোনো এক বিস্ময়ের রাতে
আমারেও ডাকেনি কি কেউ এসে জ্যোৎস্নায় – দখিনা বাতাসে 
     ওই ঘাইহরিণীর মতো ?
 
     আমার হৃদয় – এক পুরুষহরিণ –
     পৃথিবীর সব হিংসা ভুলে গিয়ে 
চিতার চোখের ভয় – চমকের কথা সব পিছে ফেলে রেখে
           তোমারে কি চায় নাই ধরা দিতে ?
            আমার বুকের প্রেম ঐ মৃত মৃগদের মতো 
            যখন ধূলায় রক্তে মিশে গেছে
            এই হরিণীর মতো তুমি বেঁচেছিলে নাকি 
            জীবনের বিস্ময়ের রাতে 
            কোনো এক বসন্তের রাতে ?
 
            তুমিও কাহার কাছে শিখেছিলে !
মৃত পশুদের মতো আমাদের মাংস লয়ে আমরাও প’ড়ে থাকি ;
বিয়োগের – বিয়োগের – মরণের মুখে এসে পড়ে সব 
                                 ঐ মৃত মৃগদের মতো –।
প্রেমের সাহস-সাধ-স্বপ্ন লয়ে বেঁচে থেকে ব্যথা পাই, ঘৃণা –মৃত্যু পাই ;
                                              পাই না কি ?
 
              দোনলার শব্দ শুনি ।
              ঘাইমৃগী ডেকে যায় ,
              আমার হৃদয়ে ঘুম আসে নাকো 
              একা একা শুয়ে থেকে ;
বন্দুকের শব্দ তবু চুপে চুপে ভুলে যেতে হয় ।
               ক্যাম্পের বিছানায় রাত তার অন্য এক কথা বলে ;
               যাহাদের দোনলার মুখে আজ হরিণেরা মরে যায়
হরিনের মাংস হাড় স্বাদ তৃপ্তি নিয়ে এল যাহাদের ডিশে 
                      তাহারাও তোমার মতন ;-
ক্যাম্পের বিছানায় শুয়ে থেকে শুকাতেছে তাদেরো  হৃদয় 
              কথা ভেবে – কথা ভেবে – ভেবে ।
এই ব্যথা ,- এই প্রেম সব দিকে রয়ে গেছে ,-
      কোথাও ফড়িঙে-কীটে ,- মানুষের বুকের ভিতরে ,
                                       আমাদের সবের জীবনে ।
বসন্তের জ্যোৎস্নায় ওই মৃত মৃগদের মতো 
                                   আমরা সবাই ।

এ সম্পর্কিত আরও