মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আগলে কলকাতা

প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭ at ৪:৪৯ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আজকাল পত্রিকায় একটি বিশেষ নিবন্ধ লিখেছেন কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসের কর্মকর্তা তারিক হাসান। লেখাটি সমকাল অনলাইনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিজয় অর্জন। কলকাতা সাক্ষী বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের। সাক্ষী কলকাতার বেশ কয়েকটি বাড়িও। মুক্তিযুদ্ধের সেই সব স্মৃতি আগলে রেখেছে কলকাতা। সযত্নে লালন করছে ইতিহাসের স্মৃতি।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের লড়াই শুরুর পর বিদেশে প্রথম বিদ্রোহও হয়েছিল পার্ক সার্কাসের কাছে ৯ নম্বর সার্কাস অ্যাভিনিউয়ের একটি বাড়ি থেকে। সেই বাড়িটি এখন কলকাতার বাংলাদেশ উপ–দূতাবাস (তখন পাকিস্তান উপ–দূতাবাস)। আর সার্কাস অ্যাভিনিউ এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরণি। ১৯৭১ সালের মার্চে কর্মরত ৭৪ জনের মধ্যে বাঙালি ছিলেন ৭০ জন। তারা সবাই বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল গঠিত হয় মুজিব নগর সরকার। পরের দিনই অর্থাৎ ১৮ এপ্রিল কলকাতায় পাকিস্তানের তৎকালীন ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলি এই বাড়িতেই বিদেশের মাটিতে প্রথম পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এই বাড়ি থেকেই পরিচালিত হতো স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের তিনটি দপ্তর। কলকাতায় এমন অন্তত ২৫টি বাড়ি রয়েছে, যেগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বুকে আগলে রেখেছে।

মুক্তিযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। কলকাতায় গড়ে উঠল মুজিব নগর সরকার। আর বাংলাদেশের সেই সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় হয়ে উঠল ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের একটি বাড়ি। সেটি এখন অরবিন্দ ভবন। পথটির নাম বদলে হয়েছে শেক্সপিয়র সরণি। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রধান কার্যালয় থেকেই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলি ও প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানির দপ্তরও ছিল এই বাড়িটি। অর্থ, ক্যাবিনেট, স্বরাষ্ট্র, পরিকল্পনা, প্রতিরক্ষা, কৃষি ও সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন— মোট ৭টি দপ্তর চলত এখান থেকে। পরিচালিত হত মুক্তিযুদ্ধ জয়ের রণকৌশল।

৩/১ ক্যামাক স্ট্রিটের বাড়িটি থেকে পরিচালিত হত ত্রাণ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম। ৩৯ ড. সুন্দরীমোহন অ্যাভিনিউ। এখানে থাকতেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চার নেতার পরিবার। সাততলা বাড়ির ১৩টি ফ্ল্যাটের ৫২টি ঘর বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। এই বাড়িটি এখন ব্যক্তিগত মালিাকানাধীন।

মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের। সেই বেতার কেন্দ্রটি পরিচালিত হতো বালিগঞ্জের ৫৭/৮ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটি বাড়ি থেকে। এই বাড়িটিও এখন ব্যক্তি মালিকানায় চলে গেছে। তবে বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের সাক্ষ্য এরকম অনেক ভবন এবং স্থাপনাকে বুকে ধারণ করে আছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাশে থাকা কলকাতা।

পার্ক সার্কাসের সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মিডিয়া সেন্টার। সেটি এখন বাংলাদেশ লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফর্মেশন সেন্টার। বাড়িটি ছিল অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মামা হাসান সোহরাওয়ার্দীর। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও এই বাড়িতে বহু সময় কাটিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পাঠানো হতো এই বাড়ি থেকে। বাংলাদেশ লাইব্রেরিতে ২০ হাজারেরও বেশি দুর্লভ বই আছে। একই রকমভাবে ইতিহাসের সাক্ষী আকাশবাণী ভবন এবং ভবানীপুরের সানি ভিলাও।

এ সম্পর্কিত আরও