Mountain View

ডাকসু নির্বাচন কি আদৌ হবে?

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ২০, ২০১৮ at ১:১০ অপরাহ্ণ


উচ্চ আদালত ৬ মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেওয়ার পরপর সক্রিয় হয়ে ওঠে ক্যাম্পাসের ছাত্র সংগঠনগুলো। উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর সচল হচ্ছে ২৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে অচল থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। গত বুধবার উচ্চ আদালত ৬ মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের নির্দেশ দেন। এর পরপরই সক্রিয় হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাসের ছাত্র সংগঠনগুলো।

উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে উচ্চ আদালতের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেকেরই।

তারা বলছেন, এর আগেও বারবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও ডাকসু নির্বাচন হয়নি। এবারও ব্যতিক্রম হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সদিচ্ছা আর ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের একক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শঙ্কাও প্রকাশ করছেন তারা। তবুও আশায় বুক বাঁধছেন তারা। এ নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ২৭ বছর পর ফিরে পাবে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার।

জানা গেছে, বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলে উঠেছিল ডাকসু। দেশকে এগিয়ে নেয়ার নেতৃত্ব তৈরির আঁতুড়ঘর এটি। ছাত্রদের অধিকার আদায় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ারও। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনাকারী সংগঠন ডাকসু। কিন্তু দীর্ঘ ২৭ বছর নির্বাচন হয়নি ছাত্র আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় নির্দলীয় মঞ্চের। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ৬ জুন ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। এরপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং মাঝে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কেউই ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়নি।

১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ডাকসু থেকে নির্বাচিত ৫ জন প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম সিনেটে থাকার কথা। কিন্তু দীর্ঘ দিন নির্বাচন না হওয়ায় ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই সিনেট সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরই মাধ্যমে ছাত্ররা আন্দোলন করে যে দেশে গণতন্ত্র এনেছেন, তাদের গণতন্ত্র চর্চার সবচেয়ে বড় প্লাটফর্মটিই হারিয়ে ফেলেছেন।

গণতান্ত্রিকভাবে সর্বজনীন নেতা নির্বাচনের সুযোগ হারিয়েছেন। তবে যখনই বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কোনো ভিসি পদ গ্রহণ করেন তখনই তিনি বলেন, পরিবেশ তৈরি করে ডাকসু নির্বাচন দেয়া হবে। সর্বশেষ ডিসেম্বরে এক অনুষ্ঠানে ভিসি অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ডাকসুর নির্বাচন না হওয়ার ২৭ বছরের সংস্কৃতি হতে বেরিয়ে আসতে চাই। আমরা ডাকসু নির্বাচন ইনশাআল্লাহ করব।’ কিন্তু সেই আশ্বাস আশ্বাসই থেকে যায়, নির্বাচনের আর দেখা মেলে না।

এদিকে, ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। তারা কোনো জোরালো আওয়াজ তুলতে না পারায় তা খুব একটা আমলে নেয়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

কিন্তু ২০১৭ সালের মার্চে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ বলেছিলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন ইজ আ মাস্ট’। রাষ্ট্রপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের এমন বক্তব্যের পর থেকেই মূলত জোরদার হতে থাকে ডাকসু নির্বাচনের দাবি। ডিসেম্বরে এ দাবিতে আমরণ অনশনে বসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ওয়ালিদ আশরাফ নামে এক শিক্ষার্থী। সর্বশেষ উচ্চ আদালতের রায়ের পর নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনেকটা আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। এ কারণে আশায় বুক বাঁধছেন সবাই। এ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে তারা ২৭ বছর পর ফিরে পাবেন তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার।

জানা যায়, ডাকসু নির্বাচনে পদক্ষেপ নিতে ৩১ শিক্ষার্থীর পক্ষে ২০১২ সালের ১১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রক্টর ও কোষাধ্যক্ষকে লিগ্যাল নোটিশ দেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই নোটিশের কোনো জবাব না দেয়ায় ওই বছরের ২১ মার্চ রিট আবেদন করা হয়।

এ রিট আবেদনের ওপর শুনানি শেষে ওই বছরের ৮ এপ্রিল রুল জারি করেন আদালত। রুলে ডাকসু নির্বাচন করার কেন নির্দেশ দেয়া হবে না এবং নির্বাচন করার ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। শিক্ষাসচিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার ও প্রক্টরকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

এছাড়া ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, সাধারণ সম্পাদক মোশতাক হোসাইন ও বর্তমান শিক্ষার্থী জাফরুল হাসান নাদিম আরেকটি রিট করেন। ওই রিট আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে ১৯ মার্চ রুল জারি করা হয়। ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। সেই রুলের নিষ্পত্তি করেই গত বুধবার হাইকোর্ট এক রায়ে ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতের এই নির্দেশের পর ক্যাম্পাসের ছাত্র সংগঠনগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসা বাম ছাত্র সংগঠনগুলো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। এ খবর আনন্দের বলে জানিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগও। তবে বর্তমানে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পারা ছাত্রদল নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী হলেও নির্বাচন আয়োজনে প্রশাসনের সদিচ্ছার ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল সব ছাত্র সংগঠনকে নিয়েই ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে হয়।

মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়। একসময় ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনের সমান রাজনীতির সুযোগ থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় ক্যাম্পাস দখলে নেয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ছাত্রদলের সহাবস্থান নেই। বাম সংগঠনগুলো সক্রিয় হলেও সংখ্যায় কম। তাই সবাইকে একত্র করে নির্বাচন আয়োজন করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

ছাত্র সংগঠন সূত্র বলছে, ডাকসু নির্বাচনের একটি বাধা হলো নিয়মিত ছাত্র সংক্রান্ত ধারাটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষার্থী। তারাই ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। তবে বর্তমান ছাত্রনেতাদের একটি বড় অংশই অনিয়মিত ছাত্র। এ নির্বাচন হলে তারা তাতে অংশ নিতে পারবেন না।

সূত্র জানায়, যে সরকার ক্ষমতায় আসে তখন তাদের ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। আর সরকারের নির্দেশনা না পেয়ে ভিসিরাও নির্বাচনের আয়োজনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেননি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ-১৯৭৩ অনুযায়ী পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধির উপস্থিতির বাধ্যবাধতা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন, উচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন, আমরা এখনও রায়ের কপি পাইনি। কপি হাতে পেলেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, ডাকসু নির্বাচন আমাদের প্রাণের দাবি। দীর্ঘদিন থেকেই আমরা এ দাবি জানিয়ে আসছি। উচ্চ আদালত নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা এতে খুশি এবং আনন্দিত। অতিদ্রুতই নির্বাচনের আয়োজন করা হোক, আমরা নির্বাচনে অংশ নেব।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জাতীয় নির্বাচনের আগে সত্যিই এ নির্বাচন আয়োজন করবে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি আল মেহেদি তালুকদার বলেন, ছাত্রদল সব সময়ই ডাকসু নির্বাচন দাবি করে আসছে। এখন যদি ডাকসু নির্বাচন হয় তবে আমরা তাতে অবশ্যই অংশ নেব। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের আগে ডাকসু নির্বাচন সত্যিই দেবে কিনা সে ব্যাপারে আমরা সন্দিহান।

ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় অতিদ্রুতই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। আর সব ছাত্র সংগঠনের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাঈমা খালেদ মনিকা বলেন, ডাকসুসহ সব ছাত্রসংসদ নির্বাচন আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। উচ্চ আদালত সে বিষয়ে আদেশ দিয়েছেন। অতিদ্রুতই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হোক তা আমরা চাই।

এ সম্পর্কিত আরও

আপনিও লিখুন .. ফিচার কিংবা মতামত বিভাগে লেখা পাঠান [email protected] এই ইমেইল ঠিকানায়
সারাদেশ বিভাগে সংবাদকর্মী নেয়া হচ্ছে। আজই যোগাযোগ করুন আমাদের অফিশিয়াল ফেসবুকের ইনবক্সে।