সোমবার , জুলাই ১৬ ২০১৮, ৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site
প্রচ্ছদ > অন্যান্য > অবনী বাড়ি নেই (গল্প)
Mountain View

অবনী বাড়ি নেই (গল্প)


ইসরাত তানিয়া

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রায়হান আলী। এটুকু লিখেই রায়হান আলীর নামটা কালো রেখা টেনে মাঝ বরাবর কেটে দেয় কেউ। তার মনে হয়, অবনীই ঠিকঠাক।

অথচ গল্পটা রায়হানের। হয়তো কারো মনে পড়ে যায়, একটি নির্দিষ্ট বিন্দুকে ঘিরে সমান দূরত্বে এবং একই সমতলে অবস্থিত সমস্ত বিন্দুর সংকলন নিয়েই বৃত্ত। রায়হান গল্পের কেন্দ্রবিন্দু হলে পিয়া আর অবনী, এই দুই নারী চরিত্র কি রায়হান থেকে সমদূরে অবস্থিত? এমনও তো নয়। বরং অবনী নামক বিন্দুকে ঘিরেই ঘুরপাক খায় রায়হান আর পিয়া। এই মীমাংসায় এসে একটা সিদ্ধান্ত নেয় সে। এই আবদ্ধ বক্ররেখার ভেতরে যে স্থানটুকু, সেখানেই এই গল্পের সসীম অবস্থান। বৃত্তের বাইরের অসীম অঞ্চলে যা কিছু, আপাতত দূরস্থিত থাক।

বৃত্তের ভেতরে একটা খোলা জানালা দেখা যাচ্ছে। আংশিক জং ধরা গ্রিলের ভেতর দিয়ে ঢুকে গেলে ওপাশে শোয়ার ঘরে রোদ খেলছে। খাটের ওপরে রায়হান আলীর ঠিক পায়ের কাছে, রোদের রেখায় ভরপুর ভাসছে নাগরিক ধুলোবালি। গ্রিলের ওপাশে ছাতিম আর সোনালু পাতার ঝিরিঝিরি। রিকশার ক্রিং ক্রিং সদ্য পিচঢালা রাস্তায়।

হেমন্তে প্রায়ই ছাতিমের ঘ্রাণ ভাসে ঘরে। ধানমন্ডি দশের এদিকটায় বেশ গাছগাছালি। নইলে সাবেকি বাড়িগুলো ভেঙে হাইরাইজে ঢাকা শহর কংক্রিটের স্তূপ। এখনই খাটের সাইড টেবিলে ‘ঠক’ করে নিজের কফির কাপ রাখবে পিয়া। রায়হানের হাতে আরেকটা কফির মগ ধরিয়ে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে যাবে।

আজ সাপ্তাহিক ছুটি। একদিনের অখণ্ড অবসর। ছুটির দিনেও সকাল সকাল ঘুম ভাঙে রায়হানের। তবে আজ কেমন অল্প ঘুমে চোখ বোজা। বাঁ দিকে পাশ ফিরে ওর মনে হবে— নিয়তি মানে নিয়ন্ত্রণহীন অসহায়ত্ব, যা কিছু অবশ্যম্ভাবী, অবশ্যই ঘটবে সেটা তুমি চাও কিংবা না চাও। কিন্তু সুখকর কিছু যদি জোটে, যা এড়িয়ে যাওয়া সাধ্যাতীত? সে-ও তো অবধারিত নিয়তি অথচ অসহায়ত্ব নয়। এসব ভাবতে ভাবতেই পায়ের চারপাশে রোদের নরম ওম টের পাচ্ছে রায়হান। কেমন করে যেন বুঝতে পারে, আজ সারা দিন অবনী সাথে থাকবে। অবনী ন’মাসে কি ছ’মাসে, একবার কি দুবার আসে। কিন্তু আসে ঠিকই।

ধোঁয়া ওঠা কফি ছাড়া রায়হানের দিন শুরু হয় না। বিয়ের পর পর পিয়া খুব অবাক হতো। রায়হান কফির কাপে ঠোঁট ছোঁয়ালে ভ্রু কুঁচকে, চোখ সরু হয় পিয়ার। যেন পিয়ার নিজেরই ঠোঁট পুড়ে যাচ্ছে। কফি বা চা, বলা বাহুল্য, ঠাণ্ডা না হলে পিয়া খেতে পারে না। জিভ পুড়ে যায়। ব্যস্ততার সময় গরম চা কিংবা কফি খেয়ে জিভ পুড়িয়ে পিয়া বেশ কয়েকবার কষ্ট পেয়েছে। তেমন কিছু না। কয়েক দিন অবশ গাল আর জিভের ওপর কুয়াশার পরত নিয়ে থাকা যথেষ্ট অস্বস্তির ব্যাপার।

হাতে কফির মগ নিয়ে বিছানায় আধ শোয়া হয়ে রায়হান দেখছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে পিয়া তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছল। রাতে করা বেণীর বাঁধন আলগা হয়ে চুল বেরিয়ে কানে, ঘাড়ে লুটিয়ে পড়ছে। এতেই আদর আদর লাগছে। ঠাণ্ডা কফির কাপ হাতে রায়হানের কাছে গিয়ে বসল পিয়া।

মুখে, হাতে লোশন ঘষতে ঘষতে বলল, ‘নাশতা করেই বেরোব।’ সামনের মাসে ওর ছোট বোন রিয়ার বিয়ে। দুই মাস ধরেই সাজ সাজ রব। বিয়ের কেনাকাটা শুরু হয়েছে অনেক আগেই। এর যেন আর শেষ নেই। অথচ পিয়া একদম সময় দিতে পারছে না।

‘ওয়েডিং কালেকশন্সে কথা বলেছিলে? ফোন করতে বলেছিলাম’, পিয়া হালকা গলায় জিজ্ঞেস করে।

‘ভুলে গেছি একদম।’

‘একটাই কাজ দিলাম, ভুলে বসে আছো!’ লোশন ঘষা থামিয়ে হতাশ গলায় বলে পিয়া, ‘কার্ডগুলো নিয়েছিলে?’

‘দিয়ে দিয়েছি।’

স্বস্তির হাসি পিয়ার ঠোঁটের দুকোণে। রায়হান-পিয়া দুজনই ব্যাংকার। সারাটা সপ্তাহ দম দেয়া পুতুলের মতো ছুটতে হয় ওদের। দুটো আলাদা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে ওরা। রায়হানের পনের বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ার গ্রাফ তরতর করে ঊর্ধ্বগামী। দুবার চাকরি বদলেছে এরই মধ্যে। পিয়াও ভালোই করছে। ছুটির দিনগুলোয় ওরা একসাথে সময় কাটায়। রায়হান একটু ঘরমুখো। কানকোর রঙ বুঝে মাছ কেনা ওর কম্মো নয়। ঘরের ধুলোঝাড়া থেকে রান্না— সমস্ত কাজ পিয়ার।

পিয়া কফির কাপ হাতেই উঠে দাঁড়াবে। রায়হানের গালে টুক করে চুমু খেয়ে রান্নাঘরে ঢুকে যাবে। রায়হান লক্ষ করেছে এখনো পর্যন্ত পিয়া কাপে চুমুক দেয়নি। আচ্ছা পাগল! কাজের লোককে সশব্দে নির্দেশনা দিচ্ছে পিয়া। কথার সাথে তেল মসলার গন্ধ ভেসে আসছে এ ঘরে।

বিছানা ছাড়ল রায়হান। সিগারেট ধরিয়ে এক ফুসফুস ধোঁয়া ওড়াল। বাথরুমের জানালায় একটা পাতি চড়ুই এসে বসেছে। কার কার্নিশে, কোন কড়িকাঠে ঘর বেঁধেছে কে জানে? পালকের বাদামি ধূসরতার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে হঠাৎ ওর মনে হলো অবনী যদি জানত, ওকে কতটা ভালোবাসে রায়হান ও কী করত? কী যে অবনী করত সে অব্দি রায়হান কোনো দিন চিন্তা করে উঠতে পারেনি। অবনীর প্রবল ব্যক্তিত্বের এক মুগ্ধ দর্শকই ছিল সে।

প্রেমিক কি বলা যায়? এ পর্যন্ত ভেবে থমকে গেল রায়হান। শাওয়ারের নিচে দাঁড়াল। শাওয়ার ছাড়ল। মাথা ঠাণ্ডা করা জরুরি। ঘোরটা কাটানো দরকার এবং এক্ষুনি।

একেকটা দিন আসে। সে দিনটা শুধু অবনীর। সকাল থেকে রাতভর। অবনী আসেই এমন হুটহাট। তবে কখনো ছুটির দিনে আসে না। আজকের দিনটা ব্যতিক্রম। ভাগ্যিস আজ পিয়া শপিংয়ে যাচ্ছে। নইলে সারা দিন দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো রায়হানকে। কখন কী বলে ফেলে অবনীকে, পিয়ার সামনে। পিয়া কি আর বুঝবে অবনী অবিচ্ছেদ্য? উল্টো কেঁদেকেটে অস্থির হবে। রায়হানকে প্রতারক বলবে, অহেতুক সন্দেহ করবে।

পিয়াকে সে কেমন করে বলবে আঁকড়ে ধরার জন্যও ডালপালা লাগে বা কিছু খড়কুটো। তখন নিয়তি ঘূর্ণিপাকে ক্রমাগত ঘুরপাক খেয়ে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে তলিয়ে যাচ্ছে রায়হান। অতলে তলিয়ে যাবার আগমুহূর্তে অবনী এল। অবনী যেন ওরই জন্য এমন ঘোর দুর্যোগেও হেঁটে যাচ্ছিল। অবনী এল আর ঝড়ের ঘূর্ণি থামল। সাগর শান্ত।

অবনী মিটিমিটি হেসে বলল, ‘আপনি সাঁতার জানেন। এভাবে তলিয়ে যাচ্ছেন কেন? উঠে আসুন!’

রায়হানের মনে পড়ল সত্যি সে সাঁতার জানে। চাইলেই তীরে উঠতে পারে। উঠে এল সে। সেই থেকে অবনী তার সঙ্গে সঙ্গে থাকে। কক্ষনো একা থাকতে দেয় না। তাই বলে রায়হানের কোনো কাজে সে অসুবিধা করেনি। বিরক্ত করেনি। বরং রায়হান নির্ভুল কাজ করে যায় অবনীর জন্যই।

কী এক তাচ্ছিল্যে জানালা ছেড়ে পাতি চড়ুই উড়ে গেছে ততক্ষণে।

অযুত গ্রহ-গ্রহান্তর, চাঁদ কিংবা সূর্যও তো ঈশ্বরের নির্ভুল বৃত্ত। এই পৃথিবী, এই গল্পও। কেউ ভাবছে শুধু কি বিন্দুই থাকে বৃত্তের ভেতরে? আকৃতি আর গাণিতিক ধারণার কত জ্যা, ব্যাস-ব্যাসার্ধ, ছেদকের আনাগোনা সেখানে! মা-বাবা, দীপা। বৃত্তের ভেতরে ছিল ওরাও। তখন সদ্য এমবিএ শেষ করেছে রায়হান। নীরব হার্ট অ্যাটাকে হঠাৎ চলে গেল মা। সে-ও তো প্রায় সতের বছর হয়ে গেল। ইসিজিসহ রেগুলার চেকআপ করানো হয়েছিল। সব কিছু ঠিকঠাক। কারো কিছু করার ছিল না। পরিবার কেন্দ্রচ্যুত হলো। এদিক সেদিক বেসামাল পাক খেতে লাগল। বাবা আর ছেলের এক ভরশূন্য সংসার।
একেক সময় মুহূর্তেই মায়ের শাড়ির গন্ধ বাতাসে খেলে যায়। কারণে বা অকারণে। মেথি আর ডাল ফোড়নের গন্ধ ভাগ্যবিশ্বাসী মায়ের গন্ধ হয়ে ভাসে; কিছুক্ষণ রায়হানের নাকের সামনে সাঁতার কেটে হারিয়ে যায়। মা প্রায়ই বলতেন, ‘নিয়তি! ভাগ্যে যা আছে তা-ই হবে।’ ধুলোর পাতলা স্তর জমে জুতার তাকে মায়ের একবারও না-পরা স্যান্ডেলের ওপর।
রায়হান দীপার দিকে তাকিয়ে ভেবেছিল, ছন্নছাড়া জীবনে এই একজন আছে। দীপা কোনো দিন ছেড়ে যাবে না। কিছুতেই না। দীপা আছে সব শূন্যতা বহুগুণে ভরিয়ে। দীপা মেধাবী আর সুন্দরীও। বহু মানুষের আকাঙ্ক্ষার দীপা শুধু ওকেই ভালোবাসার যোগ্য মনে করেছে। সেজন্য রায়হান বেশ গর্বিত। ভালোবাসাবাসির বয়স দুই বছর। একসাথে ক্লাসের প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্ট করতে করতে রায়হান আর দীপা ভেবেছে জীবনের সেমিস্টারটাগুলোও একসাথে পার করা যায়।
বিকেলের পড়ন্ত রোদে বাদামি ফুচকা উজ্জ্বল হয়েছিল দীপার হাতে। টক-ঝালের ঝাঁঝ আলজিভ পেরিয়ে যাবার আগেই দীপার চোখ-নাক দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। রায়হানের হাত ধরে দীপা হেঁটে গিয়েছিল টিএসসি থেকে শাহবাগ।
‘বাসাটা ছোট হবে’, এমনই কিছু বলছিল দীপা, ‘পর্দার রঙ হবে গাঢ় নীল। বিছানার চাদর হালকা আকাশি।’
রোদেলা ব্যালকনিতে ফড়িং উড়বে নাইন ও ক্লকের ম্যাজেন্টা ফুলগুলোর ওপর। দার্জিলিং যাবে ওরা। মধুচন্দ্রিমা হবে টকটকে লাল রডোডেনড্রন ফোটা মেঘের দেশে।
‘পাহাড়ের গ্রামগুলোতে এখনই ব্লুমিং।’
‘হু।’
‘আর টয় ট্রন। উফ! একদম মিস করা যাবে না।’
দীপা রায়হানের হাত ধরে চোখ বন্ধ করে বলেছিল, ‘আফটার সিক্স মান্থস! অফ টু ক্লাউডস!’
এর ঠিক তিনদিন পর দীপা ফোনে জানিয়ে দিল, আগের সন্ধ্যায় ওর বিয়ে হয়ে গেছে। ওর কিছু করার ছিল না। ব্যাস এটুকুই। ছেলে পিএইচডি করছে। কয়েক মাসের মধ্যেই দীপা আমেরিকা চলে যাবে।
মা চলে যাবার ঠিক ত্রিশ দিনের মাথায় এ ঘটনা ঘটল। কিছু অনুভব করার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না রায়হানের। মাথায় একটি কথার ধূসর ঘূর্ণি। তিনদিন আগে দীপার বলা তিনটি শব্দ, অফ টু ক্লাউডস! মেঘের দেশে যাবে দীপা। কার সাথে যাবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরফের শীতলতায় রায়হানের হূিপণ্ড অবশ। মনে হয়েছিল, দীপার ওপর আর কোনো অধিকার ওর নেই। দীপা অন্যের।
কিছু ভাবতে পারছিল না বিপর্যস্ত রায়হান। অদ্ভুত এক বিপন্নতায় আচ্ছন্ন সে। মৃত্যুর ওপার থেকে মায়ের গলা শুনতে পেল— ‘নিয়তি!’ বাতাসে তখন মেথি-ডাল ফোড়নের ঘ্রাণ। স্যান্ডেলের ওপর আরো গাঢ় হয়ে জমছিল ধুলো।
দীপা যখন ফোন করল, রায়হানের ক্লাস নেয়া শেষ। খুব স্বাভাবিক গলায় সে দীপার সাথে কথা বলেছে। আসলে বলেছিল কম। শুনছিল বেশি। রায়হানের সহজ, নিরুত্তাপ ব্যবহারে অবাক দীপা। হয়তো ভয়ও পেয়েছিল।
বাইরে নির্লিপ্ত থাকলেও ভেতরে চূড়ান্ত ক্ষয়। তীব্র দুঃখ আর অপমানে উন্মত্তের মতো হেঁটে বাসায় ফিরেছিল রায়হান। এভাবেই আলো কমে আসে আর সারাটা পথ অন্ধকার হয়ে যায়। ন্যাশনাল গ্রিডে কোনো সমস্যা। পুরো ঢাকা অন্ধকার মেখে স্তব্ধ।
সে রাতে পথ হাতড়ে বাসায় ফিরেছিল রায়হান। চার্জ লাইট, মোমবাতি কোথায় কে জানে। জানালার গ্রিল শক্ত করে দুই হাতের মুঠোয় চেপে দাঁড়িয়ে রইল। কোথাও স্থিরতা নেই। পুরো শরীরে ধারণাতীত দহন। চোখ দুটো অসম্ভব জ্বলছে। সমস্ত শরীরের কোষে কোষে তৃষ্ণা।
ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানির বোতল বের করে গলায় ঢালে। বাথরুমে গিয়ে পেটের ভেতরের অন্ধকার জলের ঘূর্ণিটাকে উগরে দেয়। একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্যোগ। মানসিক চাপে স্নায়ু অসাড়। তীব্র আত্মরতি কিংবা আত্মপীড়নে রায়হান ভারমুক্ত। বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্কের জমাট কান্নাগুলো চোখের পাতা ঠেলে বেরিয়ে এসেছিল সারা রাত। চেতনে-অচেতনে ধ্বংসস্তূপের মতো পড়ে থাকল একটা শরীর। রাতটি দীর্ঘ ছিল।
ডাইনিং টেবিলে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে বসে আছে রায়হান। পড়ছে না।
‘তোমার টোস্টে বাটার লাগিয়ে দেই?’
পিয়ার কথায় চমক ভাঙে রায়হানের। বলল, ‘দাও।’
‘শরীর খারাপ করল নাকি তোমার?’ পিয়ার গলায় উদ্বেগ।
‘না। ঠিক আছে।’

কাগজের পাতা উল্টায় রায়হান। অবশ্য এখন না উল্টালেই ভালো হতো। সাহিত্য সাময়িকী পাতায় ‘দুটি কবিতা’ ছাপা হয়েছে। কবি অনন্যা অবনী। টোস্টের সাথে বিষমও খেল রায়হান। আজ কি সে পাগল হয়ে যাবে? ওর দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয় পিয়া।
‘কী হলো তোমার?’ বলল পিয়া, ‘আমি আজ বরং না যাই। কাল গেলেও চলবে।’
‘আরে, না না। তুমি যাও। সবাই অপেক্ষা করছে। না গেলে খারাপ দেখাবে।’
‘থাকুক অপেক্ষা করে। আমি যাচ্ছি না।’
‘কী যে ছেলেমানুষি তোমার! গলায় খাবার আটকালে কি মানুষ অসুস্থ হয়ে যায়?’
‘কে তোমাকে ভাবছে বলো তো?’ পিয়ার গলায় এবার কপট রাগ।
‘আপাতত তুমি ছাড়া কেউ ভাবছে না।’
দুজন একসাথে হাসে। হাসলেও পিয়া নির্বিকার থাকতে পারে না। রায়হানের মধ্যে উদাস ভাব প্রবল। একেক দিন পিয়া রায়হানের ওপর সত্যি বিরক্ত হয়ে ওঠে। লন্ড্রিফেরত কাপড় আলমারিতে রাখতে রাখতে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কার ধ্যান করো তুমি?’ বিরক্তি লুকোনোর চেষ্টা করেনি পিয়া, ‘কিসের এত ভাবনা তোমার?’
পিয়ার ইঙ্গিত ছিল প্রাক্তন প্রেমিকা দীপার দিকে। রায়হান সামান্য হেসে বলেছিল, ‘কিছু ভাবি না! কী আবার ভাবব?’ রায়হানের শূন্যদৃষ্টি পরমুহূর্তেই আবার স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল।
রায়হান কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে কিনা পিয়া জানে না। সেদিন পিয়ার এক কলিগ বলছিল আজকাল প্রেম করা আর পানি ঢেলে খাওয়া নাকি একই ব্যাপার। পরকীয়া শব্দটি বাতিল হয়ে গেছে। স্রেফ প্রেম। করপোরেট প্রেম এখন সেকেলে। ভার্চুয়াল প্রেমের হুজুগ চলছে। হাইটেক আলগা প্রেমের সামাজিকীকরণ শুরু হলো বলে।

রায়হানের ঘোর লাগা চেহারার দিকে তাকিয়ে পিয়ার এখন এ কথাগুলোই মনে পড়ে। আপাত নিরীহ, নীতিবান রায়হানের তেমন বিশেষ কোনো সম্পর্ক পিয়ার চোখে পড়েনি। তবু মানুষের মন বলে কথা। পিয়ার নিস্তরঙ্গ মনে সন্দেহের ঢিল পড়ে। একটা বেসামাল অবিশ্বাসের ধোঁয়া তার গলার চিমনি বেয়ে উঠে আসে। চোঁয়া ঢেকুরের মতো ।
‘আমার কিন্তু ফিরতে রাত হবে। দুপুরের খাবার রেডি করা আছে। তুমি গরম করে খেও।’ ক্যাসারোলে রুটি রেখে বলল, ‘গরম থাকবে।’
‘আমি কি নিতে আসব?’
পিয়া চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘উঁহু! তেমন বুঝলে আমি ফোন করব।’
‘পৌঁছে ফোন করো।’
দরজা লাগিয়ে আবার খাবার ঘরে এসে বসে রায়হান। ফিরে যায় ষোল বছর আগের একদিনে। এ যেন বৃত্ত থেকে বিন্দুর দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়া। হতেও পারে পিছিয়ে যাওয়া। কেন্দ্রবিন্দুর দিকে বৃত্তের এই স্বতঃস্ফূর্ত ফিরে যাওয়ার কথা ভেবে কেউ উত্সুক হয়ে ওঠে। কেন এই প্রত্যাবর্তন? সেটা এক্ষুনি না জানলেও গল্পের পরিধি কিছু কমবে না। তবে এটা নিশ্চিত, কেন্দ্রের দিকে গেলেই শোনা যায় জড়তাহীন রিনরিনে এক কণ্ঠস্বর।
‘এক্সকিউজ মি, রুম নাম্বার ৩০৮ কোথায় বলতে পারেন?’ অবনী জানতে চেয়েছিল, ‘আমি থার্ড ফ্লোরে এই নাম্বারের কোনো রুমই দেখতে পাচ্ছি না!’
কম্পিউটারের ফ্ল্যাট স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে রায়হান মুখ তুলে তাকিয়েছিল। নীল রঙের শাড়ি পরে ছিপছিপে এক তরুণী টেবিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে। চোখে সোনালি ফ্রেমের রিমলেস চশমা। রায়হানের মনে হলো মেয়েটির মুখে সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে।
স্বপ্নোত্থিতের মতো সে বলল, ‘এখানে না। পাশের বিল্ডিংয়ের থার্ড ফ্লোরে।’ রায়হানের গলা আড়ষ্ট। বহু কষ্টে স্বর বেরোলো। যেন টেবলের অপর প্রান্ত নয় অন্য মহাদেশ থেকে তার কথা ভেসে আসছে।
আনমনে ফ্রিজে বাটার তুলে রাখে রায়হান। শোবার ঘরের দিকে যায়। আজ খুব কবিতা পড়তে ইচ্ছে করে তার। মন যদি শান্ত হয়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র পাতা এলোমেলো উল্টিয়ে যায় সে।
‘আপনি এখনো কবিতা পড়েন?’
‘সব সময় না। মাঝে মাঝে। তবে তোমার প্রকাশিত প্রায় সব কবিতাই পড়া আছে।’
‘তাই!’
কল্পনায় রায়হান এগিয়ে এসে অবনীর হাত ধরে। বলে, ‘অবনী, তুমি এত ভালো কেন? এমন ভালোই থেকো।’
রিনরিন করে অবনী হাসে। এই হাসিটা সে হেসেছিল প্রথম দিন। যেদিন রায়হান বলে দিয়েছিল রুম নাম্বার ৩০৮ কোথায়। হেসে রায়হানকে ধন্যবাদ জানিয়ে অবনী ক্লাস নিতে চলে গিয়েছিল। নিজের অজ্ঞাতেই হাসি ফেরত দিয়েছিল রায়হান।
অবনীর সাথে খুব বেশি কথা হয়নি তার। অবনীর সব কথা সে বুঝতেও পারত না। অলৌকিক হাসিতে হাওয়ায় উইন্ড চাইম দুলত। অবনী পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে রায়হান মনে মনে অসংখ্যবার উচ্চারণ করত অবনী, অবনী, অবনী… এক বিস্ময়কর রোমাঞ্চ। সুখ আবার তীব্রতম দুঃখও।
‘এই যে রায়হান স্যার! ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্টের হ্যান্ড আউট আছে না আপনার কাছে?’
‘আছে।’ অবনীকে দেখে কেঁপে ওঠে রায়হান। তাকিয়েই থাকে। যেন অন্ধকারে দেয়ালের ফুটো দিয়ে দূরের এক আলোর বিন্দু দেখছে।
‘পেন ড্রাইভে দিন তো প্লিজ।’

সেদিন পেন ড্রাইভ দেয়া কিংবা নেয়ার সময় অবনীর হাতের একটু অপ্রত্যাশিত ছোঁয়ায় রায়হানের বুকের ভেতর বিস্ফোরণ। এমনই বিস্ফোরণ, অবনী যেন সে শব্দ শুনতে না পায়, তাই রায়হান পিছু হটে গিয়েছিল। সে জানে অবনী কিছুই লক্ষ করেনি। না স্পর্শ, না পিছু হটা। সজ্ঞানে সবার সামনে রায়হান ডান হাতের তর্জনী দিয়ে অবনীর বাঁ গাল ছুঁয়ে দিয়েছিল। গভীর চুমু খেয়েছিল ঠোঁটে। অবনী বোঝেনি কিছুই। সবই ঘটেছিল মনে মনে। রায়হানের কল্পনায়। তুমি তা জানো না কিছু, না জানিলে…
অবনী পাশে এসে দাঁড়ালে, রায়হান চৌম্বকীয় বলয়ে কি এক অদৃশ্য আকর্ষণে সমস্ত মাধ্যাকর্ষণ নিষ্ক্রিয়। অবনী মানে পৃথিবী। তাই বুঝি সে পৃথিবীর মতোই নিজের দিকে সব কিছু এতটা প্রবল টেনে আনে। এই রায়হানকেও।
‘আপনি এখন কী পড়ছেন, অবনী?’
‘মার্কেজ পড়ছি। লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা। পড়েছেন?’
‘পড়েছি।’
‘দারুণ! আমি পড়ে শেষ করি। উপন্যাস নিয়ে জম্পেশ আড্ডা দেয়া যাবে।’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’
অবনীর সাথে আর আড্ডা দেয়া হয়ে ওঠেনি। কথাটা সামান্য ভুল হলো। চূড়ান্ত আড্ডা হয়েছে কল্পনায়। রক্তের ভেতর কী তুমুল ফিসফাস। সেখানে রায়হানের ভাবজনিত বিহ্বলতা নেই। জড়তাহীন অবিরাম সংলাপ। বাস্তবে অবনীর সামনে জবুথবু অথচ নিজস্ব জগতে রায়হান সপ্রতিভ। সেই ছিল এক পাগলবেলা। ওর ভাবনায় অবনী পা ঝুলিয়ে বসত ছাদের রেলিংয়ে। রায়হান ওর হাত ধরে থাকত। হাঁটত পূর্ণিমার মাঠে প্রান্তরে। সে অনুভব করেছিল ভালোবাসা ছাড়িয়েও কিছু অনুভূতি আছে। নামহীন কিছু একটা। যার সবটুকু ধারণ এবং অনুভব করার ক্ষমতা হয়তো মানুষের নেই।
অবনীর সাথে যতবার দেখা হয়েছে দূরে দূরে থেকেছে রায়হান। অবনীর বিয়ে প্রায় ঠিকঠাক। ভালোবাসার বিয়ে। সচেতনভাবে সে পালিয়ে বেড়ায় অবনীর কাছ থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিল অবনীর বিয়ের আগেই।
সেই যোগাযোগহীনতা রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে পত্রিকায় অবনীর কবিতা চোখে পড়ে। যেমন আজ সকালে। এর বেশি কিছু না। পনের বছরের বেশি হয়ে গেল রায়হান অবনীকে দেখেনি। ওর কথা শোনেনি।
অগণিত ধূসর দেয়াল ধসে পড়ে। অবনী বাস্তব থেকে ধীরে ধীরে চশমা-খোলা মুখখানি বৃষ্টির জলে ধুয়ে পরাবাস্তব এক জাদুকরী হয়ে যায়। একটু পরই গভীর সাগর থেকে জেগে উঠবে ও। চুল আর আঁচলে দুরন্ত নোনা বাতাসের গন্ধ নিয়ে। জলরঙের মতোই ধোঁয়াশা সে দৃশ্য দেখবে রায়হান।
অবনী আঁচল টেনে ধরে না। আঁচল উড়তেই থাকে আর হাওয়ায় লেখে নিজস্বতা।
রায়হান চুপচাপ বসে থাকে। নিজস্বতা যদি হয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, নিজের সেই অস্তিত্বের কাছ থেকে পালানো সহজ নয়। এর চেয়ে হয়তো পাহাড় ডিঙিয়ে যাওয়া সহজ। তুমি যেখানেই যাও আকাশ যাবে তোমার সাথে। বাতাস নাচবে তোমাকে ঘিরে। যত দূরেই যাও মেঘ-রোদ্দুর পাবে। ঠিক তেমনি অবনীর অনায়াস আসা-যাওয়া রায়হানের স্বতন্ত্র অস্তিত্বজুড়ে, অবলীলায় রোদ কিংবা কুয়াশা হয়ে।
রায়হান চোখ খুলে দেখে পিয়া ওর মুখের ওপর ঝুঁকে আছে। কান্না ভেজা গলায় বলছে, কী হয়েছে তোমার? ঘুমের মধ্যে কাঁদছিলে? রায়হানের বুকের ওপর আলতো করে পিয়ার ডান হাত রাখা।
রায়হান উঠে আধ শোয়া হয়ে বসে। বলে, ‘কই? না তো!’ সে বাঁ হাত দিয়ে ডান চোখের কোণ মুছে ফেলে। পিয়ার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। ওর কাঁচাপাকা রোমশ বুকে মাথা রাখে পিয়া।
গাঢ় গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘অবনী কে রায়হান? তুমি ঘুমের ঘোরে অবনী, অবনী বলে কাকে ডাকছিলে?’
এক মুহূর্তের জন্য রায়হানের হাত থেমে যায়।
পিয়াকে কিছুই বলতে পারে না। বলতে পারে না, অবনী নিছকই কল্পনা। গোচরের বাইরে অমোঘ নিয়তি। মস্তিষ্কের কোষে অশরীরী অবনীর অবস্থান। মৃত্যুতে হয়তো অবনীর সঙ্গে ওর বিচ্ছেদ হবে।
টেবিল ল্যাম্পের লাইট অফ করে রায়হান। পিয়াকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে।

‘অবনী কেউ না!’ সে বলে, ‘‘আগে তো অনেক কবিতা পড়তে। শক্তির ‘অবনী বাড়ি আছো’ পড়োনি?’’

আবার পিয়ার চুলে হাত বুলিয়ে দেয় রায়হান।
‘বিকেলে কবিতা পড়ছিলাম। হয়তো সেই নাম মনে রয়ে গেছে।’

রায়হান সাইড টেবিলে রাখা কবিতার বইটা তুলে নেয়। কী মনে করে আবার নামিয়ে রাখে। ক্রমশ বৃত্ত ছোট হয়ে আসে আর এভাবেই ছোট হতে হতে বৃত্ত যেন বা বিন্দুই। এসব জটিলতার কিছু না বুঝেও ওপাশে ছাতিম গাছ কী ভেবে মিহি গন্ধ হাওয়ায় মিশিয়ে দেয়।

এপাশে দুটি মানুষ নাকি বিন্দু, পাশাপাশি শুয়ে গাঢ় অন্ধকারে তাকিয়ে…

এ সম্পর্কিত আরও

Best free WordPress theme

Mountain View

Check Also

টাইব্রেকার ফেলে দায়িত্ব ও পেশাগত টানে ছুট গেলেন ক্রয়েটনা

রাশিয়ায় চলছে বিশ্বকাপ ফুটবলের মহোৎসব। সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৃষ্টি এখন রাশিয়ার দিকে। ফুটবল …