A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site
প্রচ্ছদ > জাতীয় > একুশের চেতনা : প্রভাব ও পরিণাম
Mountain View

একুশের চেতনা : প্রভাব ও পরিণাম

পূর্ববঙ্গে সংঘটিত ভাষা আন্দোলনকে এদেশের প্রথম গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। অবশ্য তেভাগাসহ বামপন্থি আন্দোলনগুলোকে বিবেচনায় না এনে। ভাষা আন্দোলনের সর্বোচ্চ প্রকাশ বায়ান্নর ফেব্রুয়ারিতে যা ‘একুশে’ নামে সর্বজনে পরিচিত। একুশের আন্দোলন দেশের সর্বস্তরের মানুষকে কমবেশি স্পর্শ করেছিল, উদ্দীপ্ত করেছিল। সূচনালগ্নে এ আন্দোলনের প্রধান কারিগর রাজনীতিমনস্ক ছাত্রসমাজ, পরে রাজনীতিকসহ শিক্ষিত শ্রেণির বড়সড় অংশ ও জনসাধারণ। সেইসঙ্গে দেখা গেছে শ্রমজীবী শ্রেণির সমর্থন এবং তাদের অনেকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, মিছিল থেকে মিছিলে। এসব কারণে দ্রুতই ছাত্র-আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়। তবু মনে রাখতে হবে এ আন্দোলন মূলত শিক্ষায়তনগুলোকে কেন্দ্র করে সূচিত, তাই এর বিস্তার দূর গ্রামের স্কুল পর্যন্ত।

প্রদেশব্যাপী বিস্তৃত এ আন্দোলনের বিশদ ইতিহাস তুলে ধরার পরিবর্তে সময়সীমার কারণে এ নিবন্ধের মুখ্য আলোচ্য বিষয় এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, তাত্পর্য, তাত্ত্বিক চরিত্রসহ বাঁকফেরানো ঘটনার সূত্রে আন্দোলনের বিচার-বিশ্লেষণ। এছাড়া একুশের চেতনা বলতে আমরা কী বুঝি তারও বিচার-ব্যাখ্যা এ আলোচনার অন্তর্গত। তবু ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক কারণে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট হিসেবে কিছু তথ্যসূত্র উল্লেখ করতেই হচ্ছে। এবং তা আন্দোলনের তাত্পর্য ও উত্স বুঝতে অপরিহার্য।

প্রসঙ্গত রাষ্ট্রভাষা বাংলা নিয়ে প্রতিবাদী রচনা এবং বিক্ষোভ ও আন্দোলন সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অপ্রিয় সত্য উল্লেখ করতেই হয় যে শীর্ষস্থানীয় মুসলিম লীগ নেতা ও পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির স্বার্থভিত্তিক মন্তব্য, বক্তব্য-বিবৃতি ও পদক্ষেপ বারবার বাঙালি ছাত্রদের প্রতিবাদী তত্পরতা উসকে দিয়েছে, আন্দোলন সংঘটনে সাহায্য করেছে। তা না হলে এ আন্দোলন কখন কীভাবে দেখা দিতো বলা কঠিন।

যেমন ১৭ মে (১৯৪৭) এক সম্মেলনে মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান বলেন, যে পাকিস্তান হতে যাচ্ছে তার রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এ বক্তব্যের প্রতিবাদে বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে প্রবন্ধ লেখেন কয়েকজন লেখক-সাংবাদিক-কবি ইত্তেহাদ ও আজাদ পত্রিকায় জুন-জুলাই (১৯৪৭) মাসে। সাপ্তাহিক মিল্লাত লেখে বলিষ্ঠ সম্পাদকীয় মন্তব্য। শুরুটা এভাবে যা আন্দোলনের তাত্ত্বিক পর্ব।

এর ধারাবাহিকতায় আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের উর্দুর পক্ষে বিবৃতির বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লেখেন পণ্ডিতপ্রবর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।

একাধিক জনের রচনায় এ তাত্ত্বিক ধারা চলেছে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৭-এর পুরো বছরটিতে। এর সাংগঠনিক প্রকাশ ঘটেছে গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও তমদ্দুন মজলিসের তত্পরতায়। সঙ্গে দু’একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ছাত্র ফেডারেশন।

দুই

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের পর সংগঠিত প্রথম আন্দোলন ১৯৪৮-এর মার্চে। স্বতঃস্ফূর্ত সূচনায় অগ্রণী ভূমিকায় ছাত্রসমাজ। গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উত্থাপিত পরিষদে বাংলার ব্যবহারিক ভূমিকা বিষয়ক প্রস্তাব তাত্ক্ষণিক নাকচ হয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ঢাকাসহ প্রদেশের বিভিন্ন শহরে ভাষা আন্দোলন। কিন্তু আন্দোলন স্থগিত করা হয় জিন্নাহ সাহেবের ঢাকা সফর নিরুপদ্রব করতে। উল্লেখ্য যে, এ সময় কলকাতায় বামপন্থিদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এশীয় যুব সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী পূর্ববঙ্গীয় প্রতিনিধিগণ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দেন।

তবে জিন্নাহ্ সাহেব তার বক্তৃতায় উর্দু রাষ্ট্রভাষার পক্ষে জোরালো ঘোষণা দেবার পর জনবন্দিত নেতার জনপ্রিয়তার প্রভাবে শিক্ষিত সমাজ, রাজনৈতিক সমাজে আন্দোলনের আগ্রহ কমে আসে। প্রায় চার বছর সময় লাগে বায়ান্নর আন্দোলন তৈরিতে। যে আন্দোলন ‘একুশে’ নামে পরিচিত। এ আন্দোলনের নীতি-আদর্শ ও তত্পরতায় ভাষিক ও জাতীয় চেতনার তাত্ত্বিক চরিত্র প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন রূপে ধরা পড়েছে— যা পরবর্তীকালে ‘একুশের চেতনা’ বাক্যবন্ধে চিহ্নিত।

কী সে একুশের চেতনা? বলা যায় একুশের চেতনার প্রকাশ ঘটেছে মূলত মিছিলে মিছিলে উচ্চারিত বিশেষ কয়েকটি স্লোগানে এবং সেইসঙ্গে আন্দোলনের নির্ধারিত কিছু লক্ষ্য এবং বিশেষ তত্পরতার বিশদ বিচারে যা পরস্ফুিট। বলাবাহুল্য যে, মিছিলে-মিছিলে উচ্চারিত প্রথম ও প্রধান শ্লোগান ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’-এর অর্থ এত স্পষ্ট যে তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু একথাও সত্য যে নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা ও প্রচলনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে সেই ভাষাভাষীদের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্বার্থ, এককথায় জাতীয় স্বার্থ যা তাদের উন্নত জীবনযাত্রার চাবিকাঠি। ইউরোপীয় জাতির রাষ্ট্রগুলোর উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনায় মাতৃভাষা-রাষ্ট্রভাষা জাতীয় ভাষার সমন্বিত তাত্পর্য বিচারে বিষয়টির গুরুত্ব স্পষ্ট। এককথায় সর্বজনীন জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি এতে নিহিত। তাই এতে জাতীয়তাবোধের প্রকাশ ঘটেনি এমন মন্তব্য সঠিক মনে হয় না।

দ্বিতীয় শ্লোগান রাজবন্দিদের মুক্তি চাই। অর্থাত্ বিনাবিচারে ও কালাকানুনে আটক রাজবন্দিদের মুক্তির তাত্পর্য নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার, ব্যক্তিক অধিকার আদায় ও রক্ষার দাবিতে পরস্ফুিট— যা আধুনিক জাতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অধিকারও বটে। পাকিস্তানে তখনো নতুন সংবিধান রচিত হয়নি এবং পাকিস্তানি শাসকবর্গ তাদের ফ্যাসিস্ট চরিত্রের কারণে সর্বদা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে এ অধিকার লংঘন করেছে। ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ রাজনৈতিক রাষ্ট্রনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করেছে ভাষা আন্দোলন বিশেষ করে একুশের আন্দোলনের মাধ্যমে। আরেকটি কথা, ছাত্রদের অজানা ছিল না কারা এই রাজবন্দি যাদের জন্য স্লোগান।

তৃতীয় স্লোগানটি অধিক তাত্পর্যপূর্ণ:‘সর্বস্তরে বাংলা চালু কর’— এর অর্থ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন যা একটি জাতির চেতনার আদর্শে মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা ভিত্তিক সমাজ গঠন। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে অর্থাত্ শিক্ষা ক্ষেত্র বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত সর্বত্র মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা। এক কথায় মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় ভাষা হিসেবে জাতীয় সংস্কৃতি ও সমাজ গঠনে এক সূত্রে গেঁথে নেওয়া— যা শুদ্ধ জাতীয় চেতনাকে বিকশিত করে তুলবে উগ্রতা পরিহার করে।

প্রসঙ্গত একটি তথ্য বিচার্য যে এ গুরুত্বপূর্ণ স্লোগানটির উত্স ও প্রেরণা সম্পর্কে এ পর্যন্ত কেউ কোনো উল্লেখ করেননি। পূর্বোক্ত স্লোগান দুটো রাজনৈতিক কারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই উচ্চারিত হয়েছে কিন্তু জাতীয়তা ও জাতিরাষ্ট্রের চেতনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সর্বস্তরে বাংলার স্লোগান স্বতঃস্ফূর্ত, না প্রগতিবাদীদের হাত ধরে তা এখন পর্যন্ত যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। এ প্রসঙ্গে আমার নিজের বক্তব্য না-ই বলি। পাছে এক দেশদর্শিতার প্রশ্ন ওঠে।

তিন

ভাষা আন্দোলন, বিশেষত একুশের আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এর স্বতঃস্ফূর্ততা সরকারপক্ষ থেকে উসেক দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। যেমন আন্দোলন সংঘটনে, তেমনি বাধা-বিপত্তি অগ্রাহ্য করার ক্ষেত্রে। উদাহরণ স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে ১৪৪ ধারা অমান্য করা। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সেক্ষেত্রে ছাত্র-যুব নেতৃত্বে দ্বিধাবিভক্তি ও রাজনীতিকদের ১৪৪ ধারা বিষয়ক বিরোধিতার বিপরীতে প্রতিবাদী ছাত্রদের কর্মসূচি পালনে দৃঢ়প্রত্যয় ও তত্পরতা যা না হলে একুশে সফল আন্দোলনে পরিণত হতো না।

তাই বলি, তথ্যনির্ভরতা নিয়েই বলি প্রতিবাদী ছাত্রগণই একুশের যথার্থ কারিগর, প্রাথমিক কারিগর। পরে এর শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে, আন্দোলনের চরিত্র বদল ঘটেছে শিক্ষিত শ্রেণিসহ শ্রমজীবী ও জনসাধারণের সমর্থনে এবং তাদের অনেকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে। একুশের ছাত্র আন্দোলন এভাবে গণআন্দোলনে পরিণত হয়ে দেশব্যাপী সমাজের সর্বস্তরে শ্রেণি নির্বিশেষে বিস্তার লাভ করেছে।

জাতীয় পর্যায়ে একুশের ভাষা আন্দোলনের দুটো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অর্জন একুশে ফেব্রুয়ারি ‘শহীদ দিবস’ পালন এবং শহীদ মিনার নির্মাণ যা প্রতিবাদী আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহূত। অবশেষে দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃত। এখানেও সেই স্বতঃস্ফূর্ততা, বিশেষ করে ঢাকায় এবং অন্যত্র শহীদ মিনার নির্মাণে। প্রেরণা বাইশে ফেব্রুয়ারি থেকে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে শ্লোগান ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’।

কে এই স্লোগানের পরামর্শক বা কার মুখে এটি প্রথম উচ্চারিত, আমরা তা জানি না। এ তথ্য সংরক্ষিত হয়নি। এবং কোনোদিন তা জানা যাবে বলে মনে হয় না। ঢাকায় প্রথম শহীদ মিনার অর্থাত্ ‘শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ’ নির্মাণের কৃতিত্ব এককভাবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলবাসী রাজনীতিমনস্ক ছাত্রদের এবং তা দলমত নির্বিশেষে। কিন্তু তেইশে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) মেডিক্যাল ছাত্র নেতৃত্বের আলোচনায় এই যে স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ তা উপস্থিত ছাত্রবন্ধুদেরই একজনের হঠাত্ প্রস্তাবে। সঙ্গে সঙ্গে তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত শহীদ বরকতের রক্তে ভেজা স্থানটিতে শহীদ মিনার নির্মাণের এবং তা মেডিক্যাল ছাত্র বদরুল আলমের নকশামাফিক। কিন্তু কে শহীদ স্মৃতি রক্ষার প্রস্তাবক তা আর কোনোদিন জানা যাবে না। তখন কেউ ছাত্রবন্ধুটিকে শনাক্ত করে রাখেননি। তাই ইতিহাস এক্ষেত্রে নির্বাকই থেকে যাবে। সরকার আড়াই দিনের মাথায় স্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙে ফেলার কারণেই বোধহয় পরবর্তী সময়ে একই স্থানে বৃহত্তর পরিসরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ যা হয়ে উঠেছে আমাদের সর্বপ্রকার রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। হয়েছে প্রতিবাদী জাতীয় চেতনার প্রতীক। উল্লেখিত দুটোই একুশের চেতনার প্রতীকী প্রকাশ।

প্রশাসন-আরোপিত ১৪৪ ধারা ভেঙে একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি পালনে সাধারণ ছাত্রদের দৃঢ় সিদ্ধান্ত যেমন একুশের বিস্ফোরক আন্দোলনের জন্মদাতা তেমনি আরেকটি তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাঙ্গণে এবং সামনের রাস্তায় ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ ছাত্র আন্দোলনকে গণআন্দোলনে পরিণত করেছিল। এ ঘটনা শুধু শহর ঢাকাতেই নয়, ঘটেছে প্রদেশের সর্বত্র জেলা শহর, মহকুমা শহর, থানা শহর পর্যন্ত। গ্রামে গ্রামে স্কুল ছাত্রদের আন্দোলন জনগণের সমর্থন পেয়েছে। আর এ কথাটিও সত্য যে গুলিবর্ষণের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট আবেগে ভর করে আন্দোলনের সর্বত্র বিস্তার।

ভাষা আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটেনি, এমন কথা অন্তত একজন আন্দোলনের ইতিহাস লেখক উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইতিপূর্বে উল্লিখিত স্লোগানগুলোর বিচার ব্যাখ্যায়, বিশেষ করে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের তাত্পর্য বিচারে এটা স্পষ্ট যে মিছিলে স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার স্লোগান দেওয়া না হলেও আন্দোলনের দাবিগুলোতে, জনসভার প্রস্তাবগুলোতে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ স্পষ্ট। সে প্রকাশ লক্ষ করা যাবে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে একুশের উত্তর প্রভাব বিচারে।

চার

একুশের উত্তর প্রভাব বিচারের পূর্বে আন্দোলনের আদর্শিক চরিত্র সম্পর্কে দু’একটি কথা বলা দরকার। ফ্যাসিস্ট চরিত্রের স্বৈরাচারী ও প্রতাপশালী মুসলিম লীগ শাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলনের স্বার্থে একে সরকারবিরোধী সর্বদলীয় ভিত্তিতে গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করা হয়। এ নীতির অন্যতম রূপকার নেপথ্যবাসী কমিউনিস্ট পার্টি যাদের তখনকার নীতি ফ্যাসিস্ট দুঃশাসন রুখতে যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ শক্তিমান গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা। সে উদ্দেশ্যে তারা সর্বশক্তিতে চেষ্টা চালিয়েছে যাতে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির লক্ষ্য ছিল আপন শক্তিতে চলা। কিছু ঘটনায় তেমন প্রমাণ মেলে। সর্বদলীয় নীতির ইতিবাচক চরিত্রের পাশাপাশি নেতিবাচক সমস্যাও কম ছিল না যা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ অন্তত জানেন, কিন্তু তা ইতিহাসে সামান্যই প্রকাশ পেয়েছে। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ অনৈক্য, ভিন্নমত, বিচ্ছিন্নতা ইত্যাদির মূলে ছিল আদর্শিক ভিন্নতা, ব্যক্তিক অহমেবাধ, নেতৃত্বভিত্তিক দ্বন্দ্ব, ভিন্নমত নিয়ে সহিষ্ণুতার অভাব ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা ইত্যাদি। নীতিগত অনৈক্যের কারণে সর্বজনীন স্বার্থের দাবি প্রকাশ্য স্লোগানে ও কর্মসূচিতে সামান্যই অন্তর্ভুক্ত করা গেছে যেজন্য আন্দোলন গণচরিত্রের হয়েও গণবিপ্লবী চরিত্র অর্জন করতে পারেনি। পারলে ‘নুরুল আমিন পদত্যাগ কর’ স্লোগান বাস্তবে পূর্ববঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বদলই নয়, ব্যাপক গণবিদ্রোহ পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগ শাসন ব্যবস্থার পতন তখনই ঘটাতো। একুশের এ সম্ভাবনা উল্লিখিত নানা কারণে বাস্তবের রূপ দেওয়া যায়নি।

একুশের উত্তর প্রভাব আমরা লক্ষ করি সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় বাঁকফেরা গুণগত পরিবর্তনে। চরিত্র বিচারে তা ছিল প্রগতিবাদী, গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী এবং লোকসংস্কৃতির পরিশীলিত আধুনিকতায়। যেমন নাটকে, সংগীতে তেমনি কবিগানে লোক সংগীতে এবং সাহিত্যের নানা শাখায় আর রাজনীতিতে এর সুপ্রভাব দেড় বছরের মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবিতে এবং যুক্তফ্রন্টের ধস নামানো অভাবিত বিজয়ে। কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসন সমরশক্তির জোরে সে বিজয় নস্যাত্ করে দিয়েছিল।

এখন প্রশ্ন, কী পরিণাম একুশের চেতনার স্বাধীন বাংলাদেশে? এর প্রকাশ শিক্ষায় দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা মাধ্যমের ব্যবহারে। কিন্তু উচ্চ শিক্ষায় ও উচ্চ আদালতের ভাষা ব্যবহারে রাষ্ট্রভাষা বাংলা পরিত্যক্ত। ইংরেজি মাধ্যম স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপক আধিপত্য। এ দুর্মূল্য শিক্ষা সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে ও জীবিকায় বাংলা অনুপস্থিত, সেখানে ইংরেজির একক আধিপত্য।

স্বভাবতই সমাজে নাগরিক জীবনাচরণে ঔপনিবেশিক রাজ ভাষা ও সংস্কৃতির একাধিপত্য। সেখানে খ্রিষ্টীয় বছর মাসের দিন তারিখ অনুযায়ী আমাদের জীবনের সময়ক্ষণ আবর্তিত। পাকিস্তান ১৯৪৭-এর আগস্টে যে পথ ধরেছিল ভাষার ব্যবহারে, শিক্ষা ও শিক্ষিতের জীবনাচরণে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও বাংলাদেশ সে পথ ধরেই চলছে।

তাই একুশের চেতনা বাংলাদেশি সমাজের মূল কেন্দ্রগুলোতে বাস্তবায়িত হয়নি। শুধু ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতেই তার প্রকাশ, একুশের দায়মোচনে। এ রাষ্ট্রকে প্রকৃত বিচারে কি ভাষিক জাতি রাষ্ট্র বলা চলে? একুশের এ পরিণাম কি প্রত্যাশিত ছিল?

এ সম্পর্কিত আরও

Best free WordPress theme

Check Also

জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি বিল উত্থাপন

নিউজ ডেস্ক,বিডি টোয়েন্টিফোর টাইমসঃ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমিকে আইনি …