A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site
প্রচ্ছদ > ফিচার > সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক লেভ ইয়াসিনের কীর্তীগাথা
Mountain View

সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক লেভ ইয়াসিনের কীর্তীগাথা

মাহমুদুন্নবী চঞ্চলঃ
কেউ বলে ‘বস্নাক স্পাইডার’, কেউবা ‘বস্নাক অক্টোপাস’ আবার অতিরিক্ত উচ্চতার জন্য ভক্তরা ডাকে ‘আইফেল টাওয়ার’ বলে। কিন্তু বাবা-মা আদর করে ডাকত লেভ ইয়াসিন বলেই। গোল পোস্টে অতন্দ্র প্রহরী হিসাবে তার তুলনা তিনি নিজেই। ক্যারিয়ারে একক প্রচেষ্টায় অনেকবার নিজ দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নকে (বর্তমানে রাশিয়া) জিতিয়েছেন তিনি। বর্ণিল ক্যারিয়ারে বহু স্ট্রাইকারের দুরনত্ম শট ঠেকিয়ে তিনি পেয়েছেন তারকা খ্যাতি। ১৪ বছরের ফুটবল জীবনে পরিষ্কার ২৭০টি শট ঠেকিয়ে তিনি অনন্য। পেনাল্টি প্রতিরোধ করেছেন প্রায় ১৫০টি। এমন সাফল্য আজ পর্যনত্ম কোন গোলরৰকের নেই। আর তাইতো বিংশ শতাব্দীর সেরা গোলরৰকের খেতাবও তার গায়ে। জিতেছেন রাশিয়ার ‘অর্ডার অব লেনন’ খেতাব। ১৯৬৩ সালে ইউরোপিয়ান ফুটবলার অব দি ইয়ারের পুরস্কার শুধুমাত্র গোলরৰক হিসাবে তিনিই পেয়েছেন। আজ পর্যনত্ম কোন গোলকিপার এমন সম্মানে ভূষিত হননি। নিজ জন্মভূমি রাশিয়াতে তাই তিনি জনপ্রিয় একজন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব। মানুষ ভালবাসে হৃদয় উজাড় করে। ফুটবল বোদ্ধাদের মতে বিশ্বের সেরা গোলরৰক তিনিই।

লেভ ইয়াসিনের ক্যারিয়ারের শুরম্নটা কিন্তু বেশ এলোমেলোভাবে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কো শহরের এক হতদরিদ্র ঘরে ইয়াসিনের জন্ম। ১৯২৯ সালের ২২ অক্টোবরে জন্ম নেয়া ইয়াসিনের পরিবারে আয় ছিল নিতানত্মই অল্প। কিশোর বয়সেই ভাগ্যন্বষণে কারখানায় চাকরি নিতে হয় তাকে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণেই এমন পেশায় ঢুকতে বাধ্য হন তিনি। মাত্র ১২ বছর বয়সে তাকে শ্রম দিতে হয় এক সামরিক কারখানাতে। চাকরির পাশাপাশি ফুটবলের যাত্রা শুরম্ন এখান থেকেই। কাজের ফাঁকে মিলিটারিদের সঙ্গে ফুটবল খেলায় মিলত কিশোর ইয়াসিন। শারীরিক উচ্চতা তখন থেকেই খুব বাড়নত্ম থাকায় গোল পোস্টেই তাঁর অবস্থান হতো। পারতেনও ভাল। বেশ দৰতার সঙ্গে শক্তিশালী শটগুলো প্রতিহত করতেন তিনি। এমন সাফল্য তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ১৯৫০ সালে ডাক আসে মস্কোর ডায়নোমো ক্লাব থেকে। কিন্তু অভিষেক ম্যাচে গোলপোস্টে ভীষণ খারাপ খেলেন তিনি। তার ব্যর্থতায় এক প্রীতিম্যাচে হেরে বসে তার ক্লাব ডায়নামো।

তবে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েননি তিনি। দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে চলেন সামনের দিকে। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ডায়নামোর ফুটবল দলের পাশাপাশি হকি দলের গোলরৰক হিসাবেও লেভ ইয়াসিন খেলেছেন বেশ কিছুদিন ধরে। এই ভার্সনে সফলতাও পেয়েছেন তিনি। হকিতে ডায়নামোর কয়েকটি শিরোপা এসেছে তার হাত ধরেই। কয়েক বছর সাফল্যের দু্যতি ছড়ানোর পর আসে সেই কাঙ্খিত মাহেন্দ্রৰণ। ডাক আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের জাতীয় ফুটবল দলে। শুরম্ন হয় আনত্মর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ার। বছর তিনেকের মাথায়ই তিনি সফল। দলকে জেতান ১৯৫৬ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের স্বর্ণ। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলে রাশিয়ান দলে জায়গা করে নেন ইয়াসিন। ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ ফুটবলে গোলরৰক হিসাবে ভাল খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। দলীয় নৈপুণ্য সঙ্গে লেভ ইয়াসিনের অসাধারণ সেভে সোভিয়েত ইউনিয়ন পেঁৗছে যায় বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে তারা পরাজিত হয় ০-২ গোল ব্যবধানে। তবে ইয়াসিনের অসাধারণ কিছু সেভিং সোভিয়েত ইউনিয়নকে বেশি গোল হজম করতে দেয়নি। বিশ্বকাপের পর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জেতে সোভিয়েত ইউনিয়ন। এখানেও ইয়াসিনের কৃতিত্ব চোখে পড়ার মতো। এর দুই বছর পরে আসে ১৯৬২ সালে চিলি বিশ্বকাপ ফুটবল। দুুরনত্ম ফর্মে তখন ইয়াসিন ।

এবারও তাঁর দল পেঁৗছে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। তবে এবার স্বাগতিক চিলির বিরম্নদ্ধে হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের। এই বিশ্বকাপে দুরনত্ম ফর্মে থেকেও কলম্বিয়ার বিরম্নদ্ধে এক ম্যাচে রীতিমতো ছন্দহীন অবস্থায় থাকেন তিনি। কলম্বিয়ার বিরম্নদ্ধে ৪-১ গোলে এগিয়ে থেকেও ম্যাচ শেষ পর্যনত্ম ৪-৪ গোলে ড্র হয়। ইয়াসিনের বিরম্নদ্ধে রীতিমতো সমালোচনার ঝড় ওঠে। সমালোচনার তীর ছুটে আসে তাঁর দিকে। গুঞ্জন শুরম্ন হয় ফুরিয়ে যেতে শুরম্ন করেছেন তিনি। কিছুটা চিনত্মার মধ্যে পড়েও যান লেভ। কিন্তু প্রতিভার ঝলকে তিনি এই বছরেই ফিরে আসেন ছন্দে। ছয় ফুট দুই ইঞ্চির উচ্চতার লেভ ইয়াসিন জেতেন ব্যালন ডি’ওর পুরস্কার। ইউরোপে রীতিমতো দাপিয়ে বেড়ানো ইয়াসিন তাই ১৯৬৬ বিশ্বকাপে আগুনের মতো জ্বলে ওঠেন। দলকে নিয়ে যান তিনি সেমিফাইনালে। ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হলেও চতুর্থ স্থানটাই ছিল সোভিয়েত রাশিয়ার জন্য অনেক বড় কিছু। ফলে আবার আলোচনায় আসেন ইয়াসিন।

তবে তিনটি বিশ্বকাপ খেলা লেভ ইয়াসিনের ক্যারিয়ার তখন শেষের দিকে। এর পরের বিশ্বকাপে আর খেলা হয়নি। ততৰণে বয়সও অনেক হয়েছে। কিন্তু তিনটি বিশ্বকাপে জাতীয় দলের এবং ক্লাব ডায়নামোর হয়ে যা করেছেন তা রীতিমতো ইতিহাস। তিনি যতবার পেনাল্টি প্রতিহত করে দলকে জিতিয়েছেন তার রেকর্ড আর দ্বিতীয়টি নেই। পুরো ক্যারিয়ারে তিনি মোট ৪৮০ বার গোলপোস্টে বল প্রতিহত করেছেন। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তিনি খেলেছেন ৭৮টি ম্যাচ। আর সব মিলিয়ে ৮১২ ম্যাচ। এরমধ্যে ক্লাব ডায়নামোতেই খেলেছেন ৩২৬টি। ১৯৭১ সালে ক্যারিয়ারে শেষ ম্যাচ খেলেন লেভ ইয়াসিন। সমাপ্ত হয় এক যোদ্ধার বর্ণিল অধ্যায়। মস্কোর লেনিন স্টেডিয়ামে প্রায় ১ লাখ ভক্তের উপস্থিতিতে ফুটবলকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানান তিনি। এমন মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত ছিলেন ব্রাজিলের কালো মানিক পেলে ও ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের মতো তারকা ফুটবলার। গভীর ভালবাসা আর শ্রদ্ধায় ভক্তরা সম্মান জানান এই শ্রেষ্ঠ গোলরৰককে। অবসর নেয়ার পরও ফুটবলের সঙ্গে থেকেছেন অনেকদিন। রক্তের সঙ্গে মিশে থাকা ফুটবলকে মৃতু্যর আগ পর্যনত্মও ভালবেসেছেন তিনি। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ১৯৯০ সালে মাত্র ৬১ বছর বয়সে এই পৃথিবী ত্যাগ করেন লেভ ইয়াসিন। বর্ণিল ক্যারিয়ারে লেভ ইয়াসিনের সেরা খেলা কোন্টি? জীবদ্দশায় নিজেই তা জানিয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৩ সালে ইংল্যান্ডের বিরম্নদ্ধে মাঠে নেমেছিল বিশ্ব একাদশ। সেই একাদশের গোল রৰক ছিলেন তিনি। আর এই ম্যাচটিই তাঁর ক্যারিয়ারে শ্রেষ্ঠ ম্যাচ। ১৯৬৮ সালে এমনই একটি ম্যাচে ব্রাজিলের বিরম্নদ্ধে বিশ্ব একাদশের সদস্যও ছিলেন তিনি। ক্যারিয়ারে যেমন খ্যাতির শীর্ষে ছিলেন তেমনি নিজ দেশকেও গৌরাবান্বিত করেছেন তিনি।

আর তাইতো তাঁর মৃতু্যর পর আজও তাঁকে গভীরভাবে স্মরণ করে তাঁর দেশের জনসাধারণ। তাঁর সম্মানার্থে মস্কোর ডায়নামো স্টেডিয়ামে নির্মিত হয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি লেভ ইয়াসিনের ভাস্কর্য। পেয়েছেন রাশিয়ার সর্বোচ্চ খেতাব ‘অর্ডার অব লেনন’। ওয়ার্ল্ড সকার ম্যাগাজিনের শতাব্দীর সেরা এক শ’ জন ফুটবলারের তালিকায় রয়েছে তাঁর নাম। আবার আইএফএফএইচএস কর্তৃক ভোটে লেভ ইয়াসিন নির্বাচিত হন শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ গোলকিপার হিসাবে। ঝলমলে সাফল্যের এবং তাঁর প্রতি সম্মানপূর্বক ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফা তাঁর নামে প্রবর্তন করেছে লেভ ইয়াসিন এওয়ার্ড। এটা শুরম্ন হয়েছে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে। প্রতি বিশ্বকাপে সেরা গোলরৰকের দেয়া হয় এই এ্যাওয়ার্ড।

এ সম্পর্কিত আরও

Check Also

মার্ক জাকারবার্গ এর জীবনের আদ্যোপান্ত

ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক–জাকারবার্গ, বর্তমানে বিশ্বের সেরা ধনীদের একজন। তাঁর আয়ের পরিমান যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে খুব …